রাতে শান্তিতে ঘুমাতে পারছেন না? বিছানায় শুয়ে অনবরত কিছু একটা কামড়ে চলেছে? যদি এমনটা হয়, তাহলে আপনার বাড়িতে ছারপোকার উপদ্রব শুরু হয়েছে। ছারপোকা তাড়ানোর উপায় জানা থাকলে এই বিরক্তিকর সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
এই নিবন্ধে, আমরা ছারপোকা সমস্যা সমাধানের জন্য কার্যকর ঘরোয়া কৌশল, প্রাকৃতিক পদ্ধতি এবং আধুনিক ঔষধ নিয়ে আলোচনা করব। আমাদের লক্ষ্য হলো আপনাকে একটি ছারপোকামুক্ত, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ উপহার দেওয়া।
ছারপোকা বুঝুন: কেন এরা আপনার বাড়িতে আসে এবং কিভাবে চিনবেন?
ছারপোকা (Bed bug) সিমিসিড গোত্রের একটি ক্ষুদ্র পরজীবী পতঙ্গ। এরা মানুষ ও অন্যান্য উষ্ণ রক্তবিশিষ্ট প্রাণীর রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকে। এই পোকাগুলো দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে আপনার রাতের ঘুম হারাম করে দিতে পারে।
ছারপোকা কী এবং কেন এটি সমস্যা?
ছারপোকা লালচে-বাদামী রঙের ছোট পোকা, যা সাধারণত ০.৫ থেকে ১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এদের শরীর চ্যাপ্টা হয়, যা এদেরকে বিছানার ছোট ছোট ফাটল বা আসবাবপত্রের কোণে লুকিয়ে থাকতে সাহায্য করে। পুরোপুরি নিশাচর না হলেও এরা সাধারণত রাতেই বেশি সক্রিয় থাকে।
এদের কামড়ে ত্বকে লালচে, চুলকানিযুক্ত দাগ দেখা যায়, যা অ্যালার্জির কারণ হতে পারে। ছারপোকার উপদ্রব কেবল অস্বস্তিকরই নয়, এটি আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কারণ এদের উপস্থিতিতে আরামদায়ক ঘুম সম্ভব হয় না।
ছারপোকার জীবনচক্র ও লুকানোর স্থান
একটি স্ত্রী ছারপোকা তার জীবদ্দশায় প্রায় ২০০ থেকে ৫০০টি ডিম পাড়তে পারে। ডিমগুলো ছোট, সাদা এবং আঠালো হয়, যা আসবাবপত্রের গায়ে লেগে থাকে। এই ডিমগুলো থেকে মাত্র ১-২ সপ্তাহের মধ্যে বাচ্চা ছারপোকা বের হয়।
ছারপোকা সাধারণত বিছানা, তোষক, বালিশ, ম্যাট্রেস, সোফা এবং অন্যান্য আসবাবপত্রের ফাটল ও কোণে লুকিয়ে থাকে। এছাড়াও, দেয়ালের ফাটল, কার্পেটের কিনারা, পর্দার ভাঁজ, ড্রয়ারের সংযোগস্থল এবং অব্যবহৃত ইলেকট্রনিক্স জিনিসেও এরা বাসা বাঁধতে পারে।
ছারপোকা আক্রমণের লক্ষণ
ছারপোকা আছে কিনা তা বোঝার জন্য কয়েকটি সুস্পষ্ট লক্ষণ রয়েছে। প্রথমত, ঘুম থেকে ওঠার পর যদি আপনার ত্বকে মশার কামড়ের মতো লালচে, চুলকানিযুক্ত ছোট ছোট দানা বা র্যাশ দেখা যায়, তবে এটি ছারপোকার আক্রমণের লক্ষণ হতে পারে। এই র্যাশগুলো সাধারণত সারিবদ্ধভাবে বা গুচ্ছাকারে থাকে।
দ্বিতীয়ত, বিছানার চাদর, বালিশের কভার বা তোশকে ছোট ছোট কালো দাগ দেখা যেতে পারে। এই দাগগুলো আসলে ছারপোকার বর্জ্য। এছাড়াও, বিছানার আশেপাশে রক্তের ক্ষুদ্র কণা বা ছারপোকার বাদামী রঙের খোলসও খুঁজে পেতে পারেন।
আসবাবপত্রের ফাটলে বা বিছানার জয়েন্টে জীবিত ছারপোকা বা তাদের ডিম দেখা গেলে বুঝতে হবে উপদ্রব গুরুতর আকার ধারণ করেছে। দ্রুত ছারপোকা সমস্যার সমাধান করা উচিত।
বিছানার ছারপোকা দূর করার ঘরোয়া উপায়: প্রাকৃতিক সমাধান
রাসায়নিক স্প্রে ব্যবহারের আগে আপনি কিছু সহজ এবং কার্যকর বিছানার ছারপোকা দূর করার ঘরোয়া উপায় চেষ্টা করতে পারেন। এই প্রাকৃতিক পদ্ধতিগুলো তুলনামূলকভাবে নিরাপদ এবং হাতের কাছে থাকা উপকরণ দিয়েই করা যায়।
উচ্চ তাপমাত্রা প্রয়োগের কৌশল
ছারপোকা এবং তাদের ডিম ধ্বংস করার সবচেয়ে কার্যকর প্রাকৃতিক উপায় হলো উচ্চ তাপমাত্রা। ছারপোকা সাধারণত ১১৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট (প্রায় ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপমাত্রার উপরে বাঁচতে পারে না।
- গরম পানিতে ধোয়া: আপনার বিছানার চাদর, বালিশের কভার, পর্দা এবং ব্যবহৃত পোশাক অন্তত ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার গরম পানিতে ধুয়ে ফেলুন। ধোয়ার পর সর্বোচ্চ তাপে শুকিয়ে নিলে পোকা ও ডিম সব মরে যাবে।
- কড়া রোদে শুকানো: তোশক, জাজিম, বালিশ এবং সোফার কুশনগুলো কয়েকদিন কড়া রোদে দিন। রোদের তাপে আসবাবপত্রের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ছারপোকাগুলো বেরিয়ে আসে বা মারা যায়। এটি ছারপোকার বংশবৃদ্ধিতে বাধা দেয়।
- স্টিম ক্লিনার ব্যবহার: ম্যাট্রেস, সোফা, কার্পেট এবং দেয়ালের ফাটলে স্টিম ক্লিনার ব্যবহার করুন। স্টিমের উচ্চ তাপ সরাসরি ছারপোকা ও তাদের ডিম ধ্বংস করে। খেয়াল রাখবেন, স্টিমের তাপ যেন সরাসরি আক্রান্ত স্থানে পৌঁছায়।
প্রাকৃতিক উপায়ে ছারপোকা দমনের কৌশল
কিছু প্রাকৃতিক উপাদান তাদের তীব্র গন্ধ বা রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের কারণে ছারপোকা তাড়াতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। এগুলো ছারপোকা দমনের প্রাকৃতিক উপায় হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
- পুদিনা পাতা বা ল্যাভেন্ডার তেল: ছারপোকা তীব্র গন্ধ একদম সহ্য করতে পারে না। বিছানার চারপাশে কয়েক ফোঁটা ল্যাভেন্ডার তেল (বা টি-ট্রি অয়েল) ছিটিয়ে দিন। শুকনো বা কাঁচা পুদিনা পাতা পিষে বিছানার নিচে রাখলেও ছারপোকা পালিয়ে যায়।
- ভিনেগারের ব্যবহার: সাদা ভিনেগার ছারপোকা মারার জন্য বেশ শক্তিশালী একটি উপাদান। একটি স্প্রে বোতলে সমপরিমাণ পানি এবং সাদা ভিনেগার মিশিয়ে নিন। এবার বিছানার কোণ, দেয়ালের ফাটল এবং আসবাবপত্রের জোড়গুলোতে ভালো করে স্প্রে করুন। ভিনেগারের অম্লীয় গুণ ছারপোকাকে মেরে ফেলে।
- নিমপাতা: শুকনো নিমপাতা গুঁড়ো করে বিছানার নিচে বা তোশকের পাশে রেখে দিলে ছারপোকা দূরে থাকে। নিমপাতার তেতো গন্ধ ছারপোকার জন্য অস্বস্তিকর।
- কেরোসিন তেল: মাঝে মাঝে আসবাবপত্রে কেরোসিনের প্রলেপ দিন। কেরোসিনের তীব্র গন্ধ ছারপোকাকে তাড়াতে সাহায্য করে। এটি খাটের বিভিন্ন ফাটলে স্প্রে করা যেতে পারে।
- অ্যালকোহল: ছারপোকা প্রবণ জায়গায় সামান্য অ্যালকোহল স্প্রে করে দিলে ছারপোকা মরে যায়। এটি ছারপোকা তাড়ানোর একটি কার্যকর উপায়।
- বেকিং সোডা: বেকিং সোডা ছারপোকার খোসার মোমের স্তর থেকে তরল শোষণ করে তাদের ডিহাইড্রেট করে। এছাড়াও, এর ছোট দানা ছারপোকার শেলে কেটে অভ্যন্তরীণ রক্তপাত ঘটাতে পারে। ম্যাট্রেস এবং কার্পেটে ছিটিয়ে কয়েক ঘণ্টা পর ভ্যাকুয়াম করে নিন। তবে এর বৈজ্ঞানিক প্রমাণ খুব শক্তিশালী নয়।
ছারপোকা মারার ঔষধ ও স্প্রে: বাণিজ্যিক সমাধান
যদি ঘরোয়া উপায় যথেষ্ট না হয়, তবে ছারপোকা মারার ঔষধ বা স্প্রে ব্যবহার করা প্রয়োজন হতে পারে। বাজারে বিভিন্ন ধরনের ছারপোকা মারার স্প্রে ও কেমিক্যাল পাওয়া যায়। সঠিক পণ্য নির্বাচন এবং নিরাপদে ব্যবহার করা জরুরি।
জনপ্রিয় ছারপোকা মারার স্প্রে ও কীটনাশক
বাংলাদেশে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ছারপোকা মারার স্প্রে পাওয়া যায়। এগুলো সাধারণত তরল বা ফোম আকারে আসে এবং ছারপোকা ও তাদের ডিম ধ্বংস করতে সাহায্য করে।
- লিকুইড স্প্রে: এই স্প্রেগুলো আস্তে আস্তে শুকিয়ে একটি প্রতিরোধী পর্দা তৈরি করে, যা ২-৪ সপ্তাহ পর্যন্ত কার্যকর থাকে。 এটি বড় ফাটল, দরজা-জানালার রেলে এবং দেয়ালের ছিদ্রগুলোতে ব্যবহার করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, Attack Bedbug Control Spray এবং Mr. Lei Bed Bug Killer Spray জনপ্রিয়।
- ফোম স্প্রে: ফোম স্প্রে সংকীর্ণ ফাটল ও গভীর ক্র্যাক-এ ছড়িয়ে গিয়ে দ্রুত ছারপোকাকে সংস্পর্শে আনে। এটি মেঝের জয়েন্ট, আসবাবের ভাঙা অংশ এবং প্যানোয়ার ক্র্যাক-এ কার্যকর।
- অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড ট্যাবলেট: এটি একটি শক্তিশালী কীটনাশক, যা ফসফিন গ্যাস উৎপন্ন করে। এটি ব্যবহারের সময় চরম সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়, কারণ এর গ্যাস মানুষের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। ঘর সম্পূর্ণ সিল করে ২৪-৪৮ ঘণ্টা খালি রাখতে হয়।
- তাসলা ১০ ডব্লিউপি: এটি একটি পাউডার ফর্মুলেশনের কীটনাশক, যাতে ল্যামডা-সাইহ্যালোথ্রিন থাকে। এটি মশা, মাছি, তেলাপোকা ও ছারপোকা দমনে কার্যকর।
স্প্রে ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি ও সতর্কতা
ছারপোকা মারার স্প্রে ব্যবহারের সময় কিছু সতর্কতা মেনে চলা আবশ্যক। ভুল ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিতে পারে।
- ঘর প্রস্তুতি: স্প্রে করার আগে ঘর ভালোভাবে ভ্যাকুয়াম করুন। বিছানা-মাদুর পরিষ্কার করুন এবং কাপড়-আসবাব গরমে ধুয়ে শুকিয়ে রাখুন।
- ব্যক্তিগত সুরক্ষা: স্প্রে করার সময় মাস্ক, গ্লাভস এবং সুরক্ষা চশমা ব্যবহার করুন।
- প্রয়োগ পদ্ধতি: লেবেলে উল্লেখিত নির্দেশনা অনুযায়ী স্প্রে করুন। আসবাবপত্রের নিচ, ফাটল এলাকা, খাটের কোণ, ম্যাট্রেসের কিনারা এবং দেয়ালের ফাটলগুলোতে লক্ষ্য করে স্প্রে করুন। কাঁথা, কম্বল এবং বালিশে সরাসরি স্প্রে করা এড়িয়ে চলুন।
- বাতাস চলাচল: স্প্রে করার পর ২-৪ ঘণ্টা ঘর খালি রাখুন এবং পর্যাপ্ত বায়ুচলাচলের ব্যবস্থা করুন।
- পুনরাবৃত্তি: প্রথম প্রয়োগের ৭-১৪ দিনের মধ্যে পুনরায় স্প্রে করলে নতুন ডিম থেকে বের হওয়া পোকা ও নিম্ফ ধ্বংস হয়।
- শিশু ও পোষা প্রাণী: স্প্রে করা এলাকা শুকানো পর্যন্ত শিশু ও পোষা প্রাণীকে দূরে রাখুন।
ছারপোকা নিধনের সেরা পদ্ধতি: সমন্বিত কীটপতঙ্গ ব্যবস্থাপনা (আইপিএম)
কেবল একটি পদ্ধতি ব্যবহার করে ছারপোকা থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পাওয়া কঠিন। ছারপোকা দমনে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সমন্বিত কীটপতঙ্গ ব্যবস্থাপনা (Integrated Pest Management – IPM)। এতে বিভিন্ন পদ্ধতির সমন্বয় করা হয়।
পেশাদার পেস্ট কন্ট্রোল সার্ভিস
যদি ছারপোকার উপদ্রব মারাত্মক হয় বা ঘরোয়া পদ্ধতি ব্যর্থ হয়, তবে পেশাদার পেস্ট কন্ট্রোল সার্ভিসের সাহায্য নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। বাংলাদেশে অনেক পেশাদার পেস্ট কন্ট্রোল কোম্পানি রয়েছে যারা ছারপোকা দমনে বিশেষজ্ঞ।
- বিশেষজ্ঞ পরিদর্শন: পেশাদার টিম প্রথমে ঘরের প্রতিটি কোণ পরীক্ষা করে সংক্রমণের মাত্রা এবং ছারপোকার লুকানো স্থান শনাক্ত করে।
- সমন্বিত চিকিৎসা: তারা রাসায়নিক স্প্রে, ফোম, পাউডার এবং থার্মাল ট্রিটমেন্ট (উচ্চ তাপ প্রয়োগ) এর সমন্বয় করে। থার্মাল ট্রিটমেন্টে পুরো ঘরের তাপমাত্রা ৫০°C-৬০°C পর্যন্ত বাড়িয়ে ছারপোকা ও তাদের ডিম ধ্বংস করা হয়।
- দীর্ঘমেয়াদী সমাধান: পেশাদাররা ছারপোকা দমনের সেরা পদ্ধতি প্রয়োগ করে, যা দীর্ঘমেয়াদী সমাধান এনে দেয়।
প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও অভ্যাস
ছারপোকা সমস্যা সমাধান করতে এবং ভবিষ্যতে এর উপদ্রব এড়াতে কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা: ঘর ও আসবাবপত্র নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন। অগোছালো ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে ছারপোকা দ্রুত বাড়ে। সপ্তাহে একবার হলেও পুরো বাসা ভালোভাবে পরিষ্কার করুন।
- আসবাবপত্রের ফাটল বন্ধ করা: দেয়ালের ফাটল, কার্পেটের কিনারা এবং আসবাবের জয়েন্টগুলো সিলিকন বা সিল্যান্ট দিয়ে বন্ধ করে দিন। এতে ছারপোকা লুকানোর জায়গা পাবে না।
- ম্যাট্রেস কভার ব্যবহার: জিপারযুক্ত ম্যাট্রেস ও বক্স স্প্রিং কভার ব্যবহার করুন। এগুলো ছারপোকাকে আটকে রাখে এবং কামড়ানো থেকে বিরত রাখে।
- ভ্রমণকালে সতর্কতা: হোটেল বা অন্য কোথাও থাকার সময় বিছানা, ম্যাট্রেসের সীম, হেডবোর্ড এবং ফার্নিচারের জয়েন্টগুলো পরীক্ষা করুন। বাড়িতে ফেরার পর স্যুটকেসের সব কাপড় গরম পানিতে ধুয়ে ফেলুন।
- পুরাতন আসবাবপত্র: পুরাতন আসবাবপত্র (বিশেষ করে বিছানা, সোফা) কেনার আগে ভালোভাবে পরীক্ষা করুন যাতে ছারপোকা না থাকে।
- বিছানা দেয়াল থেকে দূরে রাখা: ছারপোকার হাত থেকে বাঁচতে আপনার বিছানা দেয়াল থেকে দূরে স্থাপন করুন।
ছারপোকা দমনের ভুল ধারণা ও সঠিক তথ্য
ছারপোকা নিয়ে কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত আছে, যা সঠিক পদক্ষেপ নিতে বাধা দেয়। সঠিক তথ্য জানা থাকলে ছারপোকা থেকে মুক্তির সহজ উপায় খুঁজে পাওয়া সহজ হবে।
- ভুল ধারণা ১: ছারপোকা শুধু অপরিষ্কার বাড়িতে থাকে।
সত্যতা: ছারপোকা পরিষ্কার বা অপরিষ্কার উভয় পরিবেশেই থাকতে পারে। তারা মূলত রক্ত পান করে বেঁচে থাকে, তাই তারা মানুষের উপস্থিতি খুঁজে বের করে এবং সেখানে বাসা বাঁধে।
- ভুল ধারণা ২: ছারপোকা শুধু রাতে কামড়ায়।
সত্যতা: ছারপোকা সাধারণত রাতে সক্রিয় হলেও, তারা দিনে বা রাতে যেকোনো সময় কামড়াতে পারে যদি তারা ক্ষুধার্ত থাকে। তীব্র আলো ছারপোকার জন্য কোনো বাধা নয়।
- ভুল ধারণা ৩: ন্যাপথলিন ছারপোকাকে চিরতরে দূর করে।
সত্যতা: ন্যাপথলিন ছারপোকা তাড়াতে কার্যকারী বলে মনে করা হয়, তবে এটি তাদের সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করতে পারে না। ন্যাপথলিন মূলত কাপড়ের পোকা দমনে ব্যবহৃত হয় এবং ছারপোকা দমনে এর কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। এটি কেবল অস্থায়ীভাবে তাদের দূরে সরিয়ে রাখে।
- ভুল ধারণা ৪: একবার কীটনাশক দিলেই সব ছারপোকা মরে যায়।
সত্যতা: এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। অনেক সময় ডিম বা ছোট নিম্ফা বেঁচে থাকে, ফলে পুনরায় উপদ্রব বেড়ে ওঠে। এজন্য ধারাবাহিক চিকিৎসা এবং পুনরাবৃত্তি প্রয়োজন।
ছারপোকা সমস্যা সমাধান: বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
ছারপোকা দমনের প্রাকৃতিক উপায় এবং রাসায়নিক সমাধান দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। তবে দীর্ঘস্থায়ী ফলাফলের জন্য কিছু বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন।
- ধৈর্য ও ধারাবাহিকতা: ছারপোকা নির্মূল একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। এক্ষেত্রে ধৈর্য ধরে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। প্রথম দফায় সফল না হলে হতাশ না হয়ে পদ্ধতিগুলো পুনরায় প্রয়োগ করুন।
- সমন্বিত পদক্ষেপ: শুধু একটি পদ্ধতির উপর নির্ভর না করে ঘরোয়া ও রাসায়নিক উভয় পদ্ধতির সমন্বয় করুন। এর পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।
- পরিবেশ সচেতনতা: স্প্রে বা কীটনাশক ব্যবহারের সময় পরিবেশ ও পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিন। রাসায়নিক পণ্য ব্যবহারের আগে লেবেলে থাকা নির্দেশনা ভালোভাবে পড়ে নিন।
- পোকার উৎস শনাক্তকরণ: ছারপোকা কোথা থেকে আসছে, তা খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি। নতুন আসবাবপত্র, ব্যবহৃত কাপড় বা ভ্রমণের সময় ছারপোকা ঘরে আসতে পারে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
ছারপোকা সম্পর্কিত কিছু সাধারণ প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো:
ছারপোকা কামড়ানোর লক্ষণ কী?
ছারপোকা কামড়ালে ত্বকে লালচে, চুলকানিযুক্ত চাকা চাকা দাগ দেখা যায়। এগুলো সাধারণত সারিবদ্ধভাবে বা গুচ্ছাকারে থাকে এবং মশার কামড়ের চেয়ে বেশি জ্বালা করে।
ছারপোকা কেন এত দ্রুত ছড়ায়?
ছারপোকা দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে এবং তাদের ছোট আকারের কারণে সহজেই লুকিয়ে থাকতে পারে। তারা জামাকাপড়, আসবাবপত্র বা লাগেজের মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।
সবচেয়ে ভালো ছারপোকা মারার ঔষধ কোনটি?
বাজারে অনেক কার্যকর ছারপোকা মারার ঔষধ রয়েছে, যেমন Temprid SC, Transport GHP, Raid Max Bed Bug & Flea Killer। অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড ট্যাবলেটও শক্তিশালী, তবে এটি ব্যবহারে চরম সতর্কতা প্রয়োজন।
কেরোসিন বা অ্যালকোহল কি ছারপোকা তাড়াতে পারে?
হ্যাঁ, কেরোসিন বা অ্যালকোহলের তীব্র গন্ধ এবং রাসায়নিক গুণ ছারপোকা তাড়াতে এবং মারতে সাহায্য করে। তবে এগুলো এককভাবে সম্পূর্ণ নির্মূলের জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে।
পেশাদার পেস্ট কন্ট্রোল কতটুকু কার্যকর?
পেশাদার পেস্ট কন্ট্রোল ছারপোকা দমনে অত্যন্ত কার্যকর, বিশেষ করে যখন উপদ্রব গুরুতর হয়। তারা বিশেষ সরঞ্জাম ও উন্নত কৌশল ব্যবহার করে, যেমন থার্মাল ট্রিটমেন্ট, যা ছারপোকা ও তাদের ডিম উভয়কেই ধ্বংস করে।